স্বাধীনতার লড়াইয়ে প্রীতিলতা এক অমর নাম

ড. জাকিয়া সুলতানা
১৩ মে ২০২৬, ০৬:৪৯ অপরাহ্ণ
স্বাধীনতার লড়াইয়ে প্রীতিলতা এক অমর নাম

বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও বটে। ধূমকেতুর ন‍্যায় আবির্ভূত মাত্র ২১ বছরের প্রীতিলতা দেশের স্বাধীনতার জন্য যে আত্মত্যাগ করেছিলেন শতবর্ষেও তা প্রজ্বল। মা প্রতিভাদেবীর আদরের ‘রাণী’ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চিনিয়েছেন দেশের জন্য, বিপ্লবের জন্য একটি জীবনকে কতোখানি মহিমান্বিত করা যায়। কী করে গর্জে ওঠা যায় শোষকের বিরুদ্ধে। তাই তো তিনি অগ্নিকন্যা।

মৃত্যুর আগে তিনি মায়ের কাছে চিঠিতে লিখে বলেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’

মহান আত্মত্যাগের কারণে আজও অসাধারণ সাহসী সেই নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে অশ্রুসজল চোখে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন দেশপ্রেমী মানুষ।

তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেওয়া বাঙালি বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তখনকার ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন ‘ফুলতার’ ছদ্মনামে। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে বীরকন‍্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম। তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী আর মা প্রতিভাদেবী ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাই বোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিলেন দ্বিতীয়।

এক সময় ধলঘাট ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসে প্রীতিলতার পরিবার। চট্টগ্রাম শহরের আসকার দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করে তারা। ছোটবেলায় অন্তর্মুখী, অনেকটা মুখচোরা ও লাজুক স্বভাবের প্রীতিলতা গৃহস্থলীর কাজে দারুণ পটু ছিল। মায়ের আদরের ছোট্ট রাণী ঘরের নানা কাজে মাকে সাহায্য করতো।

প্রীতিলতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাত বছর বয়সে ১৯১৮ সালে ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রতি ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রীতিলতার ফলাফল ছিল দারুণ। ভালো ফলাফলের জন্য সব শিক্ষকই ভীষণ স্নেহ করতেন প্রীতিলতাকে। স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষক ঊষা দির মুখে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাই এর ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ঊষা দির দেওয়া ‘ঝাঁসীর রাণী’ বইটি পড়ার সময় ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মীবাইয়ের জীবনী তার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তখন থেকেই নিজেকে অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে ভাবতে শুরু করেন প্রীতিলতা।

দশম শ্রেণির ছাত্রী প্রীতিলতা লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন বিপ্লবী বই ‘দেশের কথা’, ‘বাঘা যতীন’, ‘ক্ষুদিরাম’ আর ‘কানাইলাল’। এই সব বই প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। ১৯২৩ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের পুলিশের সাথে যুদ্ধের পর গ্রেপ্তার হন বিপ্লবী মাস্টার দ‍্যা সূর্য সেন। তাঁর বিরুদ্ধে করা হয় রেলওয়ে ডাকাতি মামলা। এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার সময়টাতে তাঁর বাড়িতে এক বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু প্রীতিলতার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়ের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেছিলেন তাঁর মা। সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি নিজেই নিজের পথ বেছে নিয়েছিলেন যা ছিল নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক শক্তিশালী বার্তা।

প্রীতিলতার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ছিল নারীর আত্মমর্যাদার এক শক্তিশালী ঘোষণা। আজকের নারীবাদী আন্দোলনও একইভাবে নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সামনে আনে। প্রীতিলতা দেখিয়েছিলেন, নারীর ভূমিকা কেবল গৃহকেন্দ্রিক নয়, তিনি নেতৃত্ব দিতে পারেন, লড়াই করতে পারেন, এবং নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন।

প্রীতিলতা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী। ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে শুরু করে কলকাতার বেথুন কলেজ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা ছিল মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রতীক। বাঁশি বাজানো, নাটক লেখা, সাহিত্য ও শিল্পে আগ্রহ এসব তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। আর্টস ও সাহিত্য ছিল প্রীতিলতার প্রিয় বিষয়।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ছুটির সময় নাটক লেখেন প্রীতিলতা এবং মেয়েরা সবাই মিলে সে নাটক চৌকি দিয়ে তৈরি এক মঞ্চে পরিবেশন করেছিলেন। প্রীতিলতা ব‍্যাডমিন্টন খেলতেন এবং দারুণ বাঁশি বাজাতেন। কলকাতায় বানারসী ঘোষ স্ট্রিটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাঁশি বাজানো উপভোগ করতো কলেজের মেয়েরা।

শিক্ষার পাশাপাশি তাঁর অন্তরে জন্ম নেয় স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে নারীর ভূমিকা কেবল গৃহকেন্দ্রিক নয়, বরং জাতির মুক্তির সংগ্রামে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইএ পড়ার জন্য ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তির পর ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা নাগের সংগঠন ‘দীপালী সঙ্ঘ’ এর সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠি খেলা, ছোরা খেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ঢাকায় দু’বছর থাকার সময় প্রীতিলতা মহান মাস্টার দার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তখন মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক।

১৯৩০ সালে আইএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেছিলেন প্রীতিলতা। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান, সঙ্গে কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বিএ পড়ার সুযোগ। বেথুন কলেজে মেয়েদের সাথে অল্প কয়েকদিনেই আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল প্রীতিলতার। প্রীতিলতার বিএ’তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সেরা হয়েছিলেন। দর্শন বিষয়ে অনার্স করার ইচ্ছে ছিল প্রীতিলতার, কিন্তু পরবর্তীতে বিপ্পবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে অনার্স পরীক্ষা তাঁর আর দেওয়া হয়নি। তখন থেকে মাস্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন তিনি। গড়ে তোলেন এক বিপ্লবী চক্র যেখানে আরও অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দিয়েছিল।

মেয়েদের নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতেন। পাশাপাশি মাস্টারদার নির্দেশে কলকাতার গোপন কারখানায় তৈরিকৃত বোমার খোল সংগ্রহ করতেন তিনি। ১৯২৯ সালে পূজার ছুটিতে চট্টগ্রামে গিয়ে বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে। এরপর প্রীতিলতা প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজে যুক্ত হন। কলকাতার বিপ্লবী চক্রের সকল প্রকার প্রশিক্ষণ তিনি দিতেন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মহানায়ক সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে যায়। টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল, সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ ও রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়। সে সময় প্রীতিলতা কলকাতায় ছিলেন। বিএ পরীক্ষা শেষে মাস্টারদার নির্দেশে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।

১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ওই একই বছরের মে মাসে প্রীতিলতার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে মাস্টারদা তাঁর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেন। এই বৈঠক চলার সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের সাথে বিপ্লবীদের বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে প্রাণ দেন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্যসেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে কচুরিপানা ভর্তি ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি পুলিশ পুড়িয়ে দেয়।

এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার প্রীতিলতাকে সন্দেহ করতে শুরু করলে মাস্টারদার নির্দেশে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। অন্য একটি বিপ্লবী গ্রুপ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হলে প্রীতিলতার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্লাবটি আক্রমণের।

১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করার জন্য একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে পুরুষের বেশে রওনা দেন। কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। প্রীতিলতা নিরাপদে নির্দিষ্ট গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কাট্টলীর সাগরতীরে প্রীতিলতা ও তার সাথীদের অস্ত্র শিক্ষা শুরু হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে বীরকন্যা প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সফল হন। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহত্যা করেন তিনি।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবন আমাদের শেখায় নারীর সাহস, তরুণদের নেতৃত্ব এবং শিক্ষার শক্তি এই তিন মিলেই সমাজে পরিবর্তন আসে। আজকের নারীবাদী আন্দোলন কিংবা তরুণদের সামাজিক সংগ্রাম সবকিছুতেই তার জীবন এক অনন্ত অনুপ্রেরণা। প্রীতিলতা কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক শহীদ নন তিনি আজকের নারীবাদী আন্দোলন ও তরুণদের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক প্রতীক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তী বিপ্লবী, অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আজ ১১৪তম জয়ন্তী। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই ইতিহাসের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার প্রতি।

 

[লেখাটি একটি জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম থেকে নেয়া]

Read more — মতামত
← Home